ঈদবাজারে ছাড়ের ছড়াছড়ি, জমে উঠেছে বিক্রি
করোনা মহামারির ধকল কাটিয়ে দুই বছর পর ঈদের কেনাকাটা স্বাভাবিক অবস্থায় এসেছে। ঈদ উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েছে নানা অফার। ব্যাংকের কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বিল পরিশোধ করলেই মিলছে গিফটসহ নগদ মূল্যছাড়। এতে ঈদের কেনাকাটা আরও জমেছে।
ফিট এলিগ্যান্স, লা রিভ, মেনয ক্লাব, প্লাস পয়েন্ট, সেইলর, ওয়েস্টিন সহ বেশ কিছু জনপ্রিয় ব্রান্ড ১০ শতাংশ ছাড় দিচ্ছে। এসব শোরুম সহ ঈদে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় ছিল ইয়োলো, আড়ং, সারার শোরুমে।
আড়ংয়ের বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের আউটলেট সুপারভাইজার সিহাব হোসেন টিবিএসকে বলেন, ঈদের কেনাকাটা মহামারি পূর্বের অবস্থায় ফিরে এসেছে।
নতুন নতুন কালেকশন এনে বেশ সাড়া ফেলেছে এবার দেশীয় ব্রান্ডগুলো।
বাংলাদেশ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির সভাপতি ও ফ্যাশন হাউস অঞ্জনসের স্বত্বাধিকারী শাহীন আহমেদ বলেন, 'এবার ফ্যাশন হাউসগুলোতে ভালো বিক্রি হয়েছে। করোনা যখন ছিলোনা সেই স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ১০ শতাংশ গ্রোথ হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঈদ উপলক্ষে অফার দেওয়ায় ক্রেতারা আরও উৎসাহিত হয়েছেন পণ্য কিনতে।'
সাবিদ রেহমান বসুন্ধরা শপিং মল থেকে অ্যাপেক্সের জুতা কিনেছেন। নগদে পেমেন্ট করে সেখানে ১৫ শতাংশ ক্যাশব্যাক পেয়েছেন। সাবিদ বলেন, 'কোন ডিসকাউন্ট বা ক্যাশব্যাক অফার পেলে পণ্য কিনতে আগ্রহ তৈরী হয়।'
জাহাঙ্গীর কবির প্রায় ২০ হাজার টাকার পোশাক কিনেছেন পরিবারের জন্য। তিনি বলেন, 'ব্যাংকের কার্ডে কেনাকাটা করার জন্য ক্যাশব্যাক পেয়েছি ১০ শতাংশ।'
এদিকে ওয়ালটন ফ্রিজের প্রোডাক্ট ম্যানেজার শহীদুল রেজা টিবিএসকে বলেন, 'গরমের সময়ে আমাদের ফ্রিজ, এসি যেভাবে সেল হয় ঈদকে কেন্দ্র করে সেটা ৩ থেকে ৪ গুণ বেড়েছে। পণ্য কেনায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্যাশব্যাক ক্যাম্পেইন রয়েছে আমাদের। দেশের অর্থনীতি এখন মোটামুটি সচল। মানুষের হাতেও টাকা আছে। তারা কেনাকাটা করছে, খরচ করছে, মানুষের চাহিদাও বাড়ছে। ক্যাম্পেইনগুলো আমাদের সেলকে কিছুটা বুস্ট করে। সহায়ক ভূমিকা পালন করে।'
শহীদুল রেজা বলেন, 'ঈদের বিক্রিটা শুরু হয় রোজার ঈদের আগে থেকে। রোজায় অনেকের ফ্রিজ প্রয়োজন হয়। আমাদের ৩ থেকে ৪ লাখ বিক্রির প্রত্যাশা এই ঈদকে কেন্দ্র করে। সেই টার্গেট আমরা পূরণ করেছি। আমাদের মেইন সেল হয় ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে। আগামী দুই মাসে ১৫ লাখের উপরে ফ্রিজ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা আমাদের।'
মগবাজার ওয়ালটন প্লাজার উপ-সহকারী পরিচালক সোহেল রানা বলেন, 'গত এক মাসে ৮০টি এসি ও ৬০টি টিভি বিক্রি হয়েছে। এছাড়া মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ব্লেন্ডার, রাইস কুকার ও ফ্যান ভালো বিক্রি হচ্ছে।'
সিঙ্গারের আউটার সার্কুলার রোড শাখার ব্যবস্থাপক তাওরাত হোসেন রাসেল বলেন, 'আমাদের বিক্রির গ্রোথ ১৮ শতাংশ বেড়েছে । গতকাল আমাদের শোরুমে ৭ লাখ টাকার বিক্রি হয়েছে। আজকে ৬ লাখ টাকার বিক্রি হয়েছে। ঈদে আমাদের বিক্রির টার্গেট পূরণ হয়েছে।'
সিঙ্গার রেফ্রিজারেটর, এলইডি টিভি, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন এ ৮,৬০০ টাকা পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে। এতে তাদের বিক্রিও বেড়েছে।
বেস্ট বায় এবং আকতার ফার্নিচার তাদের পণ্যে ১৫ শতাংশ করে ছাড় দিয়েছে।
রিগ্যাল ফার্নিচার দিচ্ছে ১০ শতাংশ ছাড়।
হাতিরপুলে থাকেন জাহানারা বেগমের। তিনি রিগ্যাল ফার্নিচার থেকে ড্রেসিং টেবিল কিনে ছাড় পেয়ে বলেন, 'ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছাড় দেয় এটা আমি লক্ষ রাখি। অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম ড্রেসিং টেবিল কিনবো। এবার ঈদে সেটা কিনে নিলাম।'
এছাড়াও টিভিএস নির্দিষ্ট বাইকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় দিয়েছে।
রয়্যাল অটোর ইস্কাটন শোরুমের সেলস ম্যানেজার ব্যবস্থাপক সুজায়েত আলী টিবিএসকে বলেন, 'ঈদ উপলক্ষে ডিসকাউন্ট থাকায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বাইক বিক্রি বেড়েছে।'
অফারের মধ্যেও ক্রেতারা প্রতারিত
ঈদবাজারে চলছে নানা ধরনের অফার। এসব অফারে পণ্যের বেশি মূল্য দেখিয়ে তার উপর দেয়া হচ্ছে ছাড়। এমন প্রতারণায় জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
গত ১৭ এপ্রিল পোশাকের দাম বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার নামে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে রাজধানীর নিউ এলিফ্যান্ট রোডের আইআরও নামের একটি পোশাক বিক্রয় প্রতিষ্ঠান। এমন অভিনব প্রতারণা হাতেনাতে ধরা পড়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা ও মৌখিকভাবে সতর্ক করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তর।
এ বিষয় ভোক্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল বলেন, 'একজন ক্রেতা ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ শতাংশ ছাড়ে দুই হাজার ৪৯০ টাকা দামের একটি পাঞ্জাবি কেনেন। বাসায় গিয়ে তিনি দেখেন, পাঞ্জাবিতে তিনটি স্টিকার লাগানো। প্রথম স্টিকারে লেখা দুই হাজার ৪৯০ টাকা, তার নিচে দ্বিতীয় স্টিকারে লেখা এক হাজার ৭৯০ টাকা এবং সবচেয়ে নিচে তৃতীয় স্টিকারে লেখা এক হাজার ১৯০ টাকা। পরবর্তীতে অধিদপ্তর সেখানে অভিযান চালিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকটি পোশাকের কোনোটিতে তিনটি, আবার কোনোটিতে দুটি দাম লেখা দেখতে পায়। পরে তাদের জরিমানা ও সতর্ক করা হয়।
গত ২০ এপ্রিল বনশ্রীতে অবস্থিত পোশাক ব্র্যান্ড আর্টিসানের শোরুমে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিদপ্তর। দেখা যায়, চারগুণ লাভে পোশাক বিক্রি করেছে আর্টিসান। একটি শার্টের প্যাকেটের গায়ে লেখা ১৬৯৫ টাকা। কিন্তু ভেতরে ট্যাগে লেখা ১১৯৫ টাকা। এ ছাড়া কোনো কোনো প্যাকেটের গায়ে লাগানো 'পণ্যমূল্য এবং বারকোড' মুছে দেওয়া হয়েছে কালি দিয়ে।
এ বিষয়ে অধিদপ্তরের পরিচালক মনজুর মোহম্মদ শাহরিয়ার বলেন, কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে জরিমানা করার পর আবারও একই অপরাধ করছেন ব্যবসায়ীরা। এমন পরিস্থিতিতে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হবে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ৫৭ ধারা অনুযায়ী, মামলা দায়ের হলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে অধিদপ্তরের।