যানজটের কারণে পুরান ঢাকার ব্যবসা কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ
রাজধানী ঢাকার অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা পুরান ঢাকায় যানজটের কারণে প্রায় অর্ধেক ব্যাবসা অন্যত্র সরে গেছে বলে দাবি করছেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, যানজটের কারণে এখন পুরান ঢাকার পুরান ঢাকার দোকানের মূল্যও অনেক কমে গেছে।
মঙ্গলবার (২ এপ্রিল) একটি মতবিনিময় সভায় পুরান ঢাকার যানজট নিরসনে ট্র্যাফিক পুলিশ মোতায়ন, রাস্তাগুলোর উন্নয়ন এবং প্রয়োজন অনুসারে কিছু রাস্তা একমুখীকরণ করার দাবি জানিয়েছেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত "পুরান ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে যানজটের প্রভাব ও উত্তরণের উপায় চিহ্নিতকরণ" শীর্ষক মতবিনিময় সভায় ব্যাবসাীরা এসব কথা বলেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ও কর্মকর্তা এবং পরিবহণ বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন অংশীজন পুরান ঢাকার ব্যবসা ও বাসিন্দাদের জীবনে যানজটের প্রভাব তুলে ধরেন।
তারা বলেছেন, সড়কের খোড়াখুড়ি, অবৈধভাবে ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত গাড়ি পার্কিং, অপ্রতুল সড়ক অবকাঠামো ও অকার্যকর ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে পুরান ঢাকায় সৃষ্ট অসহনীয় যানজট পরিস্থিতির কারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ অবস্থার উন্নতির জন্য তারা স্মার্ট ট্র্যাফিক সিস্টেম চালু করার পাশাপাশি নদীপথের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
যানজটের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে সভায় বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মাওলা বলেন, "যানজটের কারণে পুরান ঢাকা থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যবসা অন্য জায়গায় চলে গেছে। ১০ বছর আগে শহরের এই অংশের মৌলভীবাজার এলাকার যে দোকানের দাম ছিল ১ কোটি টাকা, সেটা এখন কমে ৫০ লাখ টাকায় নেমেছে।"
তিনি বলেন, "যানজটের কারণে অনেক বাসিন্দাই বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছেন অথবা ভাড়া বাসায় থাকছেন। সাথে সাথে আমাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনারও ব্যাঘাত ঘটছে। আমরা এখন ঠিক করে রাস্তায় হাঁটতে পারি না।"
তিনি আরো বলেন, "অনেক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে পুরান ঢাকা নিয়ে কিন্তু সেগুলো কবে বাস্তবায়ন হয় তা ঠিক নেই। এজন্য আমরা কিছু দ্রুত সমাধান চাই।"
তিনি যোগ করেন, "সরকার নির্ধারণ করেছিল, যেসব কাভার্ট ভ্যান রপ্তানিযোগ্য পণ্য পরিবহণ করে সেগুলো ২৪ ঘণ্টা বিভিন্ন জায়গায় চলাচল করতে পারবে। এই শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে কাভার্ট ভ্যানের মালিকরা লোহা, তামা, পিতলসহ সকল ধরনের পণ্য পরিবহণ করে এবং পুরান ঢাকার ছোট ছোট গলিতে ঢুকিয়ে রাস্তায় চলাচল বন্ধ করে দেয়।"
পুরাণ ঢাকার চকবাজারের ব্যবসায়ী ও ডিসিসিআই এর সাবেক সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম বলেন, "আমরা ভেবেছিলাম আমাদের ব্যবসার উন্নয়ন হবে। কিন্তু উলটো আমাদের অবনতি হচ্ছে।"
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে ডিসিসিআই এর সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, "জিডিপিতে ঢাকার অবদান ৪৬ শতাংশ যার মধ্যে পুরান ঢাকারই অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। দেশে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের বিস্তার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যার প্রায় ১৫ শতাংশ পুরান ঢাকায়।"
তিনি জানান, মৌলভীবাজার, চকবাজার ও বেগমবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার উপরে লেনদেন হচ্ছে।
তিনি যানজটের ফলে সৃষ্ট সমস্যার কথা উল্লেখ করে বলেন, ২০২২ সালে ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন গড়ে ৮ মিলিয়নেরও বেশি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। যানজটের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির ২০ টি শহরের মধ্যে ঢাকা দ্বিতীয়।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, "স্বাস্থ্য, যানজট, দূষণসহ সব দিক থেকে আমরা আজকে বিশ্বের মধ্যে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় আছি। আমরা ডেভেলপমেন্ট ওরিয়েন্টেড ট্রানজিট (উন্নয়নমুখী পরিবহণ) করেছি। কিন্তু আমাদের হওয়া উচিত ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (পরিবহনমুখী উন্নয়ন)।
তিনি আরো বলেন, "আমাদের ফার্স্ট প্রায়োরিটি হওয়া উচিত ওয়ান ওয়ে (একমুখী) ট্র্যাফিক। এখনো বাংলাদেশে মোটরচালিত যানবাহন অনেক দেশের থেকে কম। কিন্তু আমাদের অভাব হচ্ছে ম্যানেজমেন্টের।"
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যেই নানা উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, নগরের জলাবদ্ধতার বিষয়টিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং সম্প্রতি বেশকিছু খাল দখলমুক্ত করা হয়েছে যার মাধ্যমে সামনের দিনগুলোতে এ সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব হবে।
মেয়র জানান, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত কেরানীগঞ্জে নতুন বাণিজ্যিক নগরী গড়ে তোলা হবে। সেই সাথে চকবাজার ও মতিঝিলকে পুনরুজ্জীবিতকরণে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরো বলেন, রাজধানীতে যানজট নিরসন ও ট্র্যাফিক আইন অমান্যকারীদের শনাক্তকরণে ৬৪টি ইন্টারসেকশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আইওটি) প্রযুক্তি স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
ঢাকার ফুটপাত ও রাস্তা থেকে হকারদের উচ্ছেদ করার বিষয়ে তিনি বলেন, দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ৮টি স্থানকে হলুদ ও সবুজ জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে যেখানে হকাররা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য চালাতে পারবে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের চিহ্নিত লাল জোনে কেউ দোকান বসাতে পারবে না।
মেয়র তাপস বলেন, "কিছুদিন আগে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এবং এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। ইতোমধ্যে রাসায়নিক দ্রব্যাদি স্থানান্তরের জন্য যে গুদামঘর, কারখানা প্রয়োজন তা শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে শ্যামপুরে শিল্পাঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র একজন সেখানে গিয়েছেন। আমরা তাকে বাণিজ্য অনুমতি (ট্রেড লাইসেন্স) দিয়েছি।"
তিনি বলেন, "পুরান ঢাকায় যারা রাসায়নিক ব্যবসা করছেন তাদের প্রতি আমার নিবেদন এবং কঠোর হুঁশিয়ারি থাকবে। আপনারা আইন অনুযায়ী শিল্প মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে সেখানে স্থানান্তরিত হোন। না হলে ঈদের পরে আমরা চিরুনি অভিযান চালাবো। যে ভবনে রাসায়নিক গুদাম পাবো সেই ভবনের বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে।"