সচিবালয়ের আগুন নেভাতে দেরি হওয়ার পেছনে যেসব কারণের কথা বলছে ফায়ার সার্ভিস
বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) রাত ১টা ৫০ মিনিটে ঢাকার আবদুল গণি রোডে বাংলাদেশ সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে তাদের প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় লাগে।
সচিবালয় ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে হলেও আগুন নেভাতে এতটা সময় লাগা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনে কোনো মানুষ উপস্থিত না থাকলেও আগুন নেভাতে দেরি হওয়ার বিষয়টিও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
আগুন নেভানোর সময় ট্রাকের ধাক্কায় একজন দমকলকর্মী নিহত হন। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া অফিসার তালহা বিন জসিম জানান, সতর্ক সংকেত পাওয়ার দুই মিনিটের মধ্যেই ফায়ার সার্ভিস সচিবালয়ের প্রধান ফটকে পৌঁছায়। তিনি দাবি করেন, বাহিনীর প্রতিক্রিয়ায় কোনো বিলম্ব হয়নি।
তবে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, আগুন নেভানোর সময় তারা পদে পদে বাধার মুখোমুখি হয়েছেন।
প্রায় এক দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দমকলকর্মী জানান, সচিবালয়ের গেট দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করাতে তাদেরকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
তিনি বলেন, 'কেবল দুটি টার্নটেবল ল্যাডার (টিটিএল; ফায়ার ট্রাকের ওপরে ঘূর্ণায়মান প্ল্যাটফর্মে লাগানো মই) ভেতরে প্রবেশ করানো গেছে। যদি আরও টিটিএল ব্যবহার করা যেত, আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।'
সচিবালয়ের পাঁচটি গেট থাকলেও মাত্র দুটি গেট দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো প্রবেশ করতে পারে। তবে সেগুলোতেও বড় যানবাহন প্রবেশ করতে সমস্যা হয়। এক পর্যায়ে ৪ নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছেন দমকলকর্মীরা।
আগুন নেভানোর পর সচিবালয়ের ভেতর থেকে গাড়িগুলো সরানোও কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। এ সময়ও দেওয়ালের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফায়ার সার্ভিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, এর আগে বিভিন্ন সময় সচিবালয়ে ঢোকার ফটক সম্প্রসারণ করার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু কেউ কথা শোনেনি।
আগুনের ক্ষতির জন্য কাঠের ব্যবহারকেও দায়ী করেছেন কর্মকর্তারা। তারা জানান, সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নান্দনিকতার জন্য কাঠের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
কাঠ দিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের এ কাজ করার সময়ই নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু কাঠের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। এছাড়া, ভবনের প্রতিটি কক্ষ তালাবদ্ধ থাকায় দমকলকর্মীদের তালা ও জানালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়েছে।
অভিযানে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এসব বাধার কারণেই আগুন নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব হয়েছে।
সচিবালয়ের ভেতরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের সমস্যা নিয়ে কথা বলার সময় গণপূর্ত সচিব হামিদুর রহমান খান জানিয়েছেন, সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের সামনের চলন্ত করিডোরটি ভেঙে ফেলা হবে।
ট্রাকের আঘাতে নিহত দমকলকর্মী নয়নের জানাজায় স্বরাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এ ঘটনায় দায়ীদের বিচার করা হবে।
'আমার একজন কর্মী মারা গেল। এর ব্যর্থতা আমার। এ ঘটনায় বিচার অবশ্যই হবে।' তিনি জানান, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ট্রাকচালককে ইতোমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসময় পুলিশ কেন ওই এলাকায় ট্রাক প্রবেশ করতে দিলো—এমন প্রশ্নের জবাবে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'ফায়ার ফাইটাররা কাজ করার সময় সেখানে ট্রাক চলাচল করা মোটেও উচিত ছিল না, তারপরও চলছে। আমরা ইতোমধ্যেই চালককে আটক করেছি এবং আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি।'
আগুন নেভাতে এত সময় লাগার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, আগুনের ধরন, ফায়ার সার্ভিসের অ্যাক্সেস, পানির সরবরাহসহ নানা বিষয় এখানে প্রভাব ফেলেছে।
তিনি আরও বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট একসঙ্গে কাজ করে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে।